স্পোর্টস ডেস্ক : ৭ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার, ১৮:২২:১২

মেসির পরে কে? আর্জেন্টাইন ফুটবলের সামনে এখন এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। একটি ম্যাচ, একটি রাত কিংবা একটি বিদায়ী আয়োজন দিয়ে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ করা যায়; কিন্তু তাঁর জায়গায় কে দাঁড়াবেন, সেই উত্তর খুঁজতে আর্জেন্টিনাকে হয়তো আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই একটি যুগের পর্দা নেমেছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্র ছিলেন তিনি। শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট নয়—দলের খেলার ছন্দ, প্রতিপক্ষের ভয়, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস; সবকিছুর সঙ্গেই মিশে ছিল মেসির উপস্থিতি।
তাই তাঁর জায়গায় একজন খেলোয়াড় বসিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনাকে বরং মেসিকে ছাড়া নতুন করে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হবে।
অধিনায়কের আর্মব্যান্ডের প্রশ্নটির উত্তর অবশ্য অনেকটাই পরিষ্কার। মেসির পর নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার পথে সবচেয়ে এগিয়ে ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো। কোচ লিওনেল স্কালোনির নেতৃত্বের পরিকল্পনাতেও তিনি আছেন সামনের সারিতে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও লটারো মার্তিনেজও থাকবেন নেতৃত্বের কাঠামোয়।
কিন্তু ১০ নম্বর?
এই প্রশ্নের উত্তর আরও কঠিন।
স্কালোনি আগেই জানিয়েছিলেন, মেসির বিদায়ের আগে এই জার্সি কাউকে দেওয়া হবে না। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ আর্জেন্টিনাও বুঝতে পারছে, ১০ নম্বর নিছক একটি জার্সি নম্বর নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে দিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল-সংস্কৃতির বিশাল এক উত্তরাধিকার।
আলোচনায় আছেন নিকো পাজ ও ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর মতো তরুণরা। পাজ ইতোমধ্যে জাতীয় দলে মেসির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য দেখিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের অন্যতম আকর্ষণ মাস্তানতুয়োনোও দেখিয়েছেন তাঁর সম্ভাবনার ঝলক।
তবে তাঁদের কারও সঙ্গেই মেসির তুলনা করার প্রয়োজন নেই। বরং সেটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় ভুল।
মেসিকে অনুসরণ করা যায়, মেসিকে অনুকরণ করা যায়; কিন্তু মেসির জায়গা নেওয়া যায় না।
রয়টার্সের ফুটবল বিশ্লেষক সার্জিও লেভিনস্কি মেসি ও আর্জেন্টিনার সম্পর্ককে দীর্ঘদিনের ভুল বোঝাবুঝির পর হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে নতুন করে আপন করে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। একসময় যে মেসিকে দেশের মানুষ যথেষ্ট ‘আর্জেন্টাইন’ নন বলে সমালোচনা করত, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
এই পথটা অবশ্য সহজ ছিল না।
আর্জেন্টিনার হয়ে শুরুতে মেসিকে ঘিরে ছিল প্রত্যাশা, তারপর হতাশা, সমালোচনা এবং বারবার ব্যর্থতার গল্প। বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে পরাজয়ের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফিরে এসেছেন। আবার লড়েছেন। শেষ পর্যন্ত কোপা আমেরিকা জিতেছেন, বিশ্বকাপ জিতেছেন এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে নিজের জায়গা স্থায়ী করেছেন।
তাই মেসির বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়; এটি আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
তাঁর সতীর্থদের কথাতেও সেই সম্পর্কের গভীরতা স্পষ্ট। লটারো মার্তিনেজ বিদায়ের মুহূর্তটিকে বলেছেন অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও বিশেষ একটি রাত হিসেবে। আর রোমেরোর কাছে মেসির সবচেয়ে বড় গুণ শুধু তাঁর অসাধারণ ফুটবল নয়—তিনি কখনো নিজেকে সতীর্থদের চেয়ে বড় করে দেখাননি।
সেখানেই হয়তো মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়, কখনও কখনও নেতৃত্ব না দিয়েও। কীভাবে তারকা হয়েও দলের অংশ হয়ে থাকতে হয়। কীভাবে ব্যক্তিগত মহিমার চেয়ে জার্সিকে বড় করে দেখতে হয়।
এখন সেই উত্তরাধিকারই বহন করতে হবে নতুন প্রজন্মকে।
আর্জেন্টিনার সামনে তাই মেসির জায়গা পূরণ করার কাজ নেই। কাজ হলো মেসির পর একটি নতুন দল তৈরি করা। এমন একটি দল, যেখানে ১০ নম্বর জার্সি হয়তো অন্য কারও গায়ে থাকবে, আর্মব্যান্ড থাকবে অন্য হাতে, আক্রমণের দায়িত্বও ভাগ হয়ে যাবে কয়েকজনের মধ্যে।
কিন্তু সেই দলকে মেসির ছায়ায় দাঁড়িয়ে পথ চললে হবে না। নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে হবে নিজেদের শক্তিতে।
কারণ মেসির পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন একজন মেসি খুঁজে পাওয়া নয়; মেসি ছাড়া জিততে শেখা।
আর সেই শিক্ষার প্রথম দিনটি শুরু হয়ে গেল মনুমেন্টালের সেই রাতেই।
Rent for add